Daily Janabhasha ০১ অক্টোবার ২০২৬ ০৬:১৬ এ.এম
দুর্নীতিমুক্ত ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য পাঠ্যপুস্তকে ভূমি শিক্ষা প্রয়োজন
রুদ্র মোহাম্মদ ইদ্রিস॥
ভূমি মানুষের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার অনেকাংশেই ভূমির সঠিক মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল। অথচ আমাদের দেশে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা, প্রতারণা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, দীর্ঘসূত্রিতা, ঘুষ এবং প্রশাসনিক হয়রানির অন্যতম কারণ হলো সাধারণ মানুষের ভূমি আইন ও ভূমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব। তাই সময়ের দাবি হলো, বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই পাঠ্যপুস্তকে ভূমি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই নিজেদের অধিকার, দায়িত্ব এবং ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশে বহু মানুষ আজও জানেন না দলিল, খতিয়ান, খাজনার রশিদ, নামজারি (খারিজ), মৌজা ম্যাপ কিংবা বিভিন্ন জরিপের খতিয়ানের গুরুত্ব কী। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যক্তি, দালাল ও প্রতারক চক্র সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। অনেক সময় একটি ভুল তথ্য বা একটি প্রয়োজনীয় কাগজ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে মানুষ বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে বাধ্য হন। ফলে অর্থ, সময় ও মানসিক শান্তি-সবকিছুরই অপূরণীয় ক্ষতি হয়। যদি শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই এসব বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা লাভ করে, তবে ভবিষ্যতে তারা নিজের পরিবারের সম্পদ রক্ষা করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনি সমাজেও সচেতন নাগরিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
পাঠ্যপুস্তকে ভূমি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হলে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে সিএস (Cadastral Survey) খতিয়ান কী, কেন এটি তৈরি করা হয়েছিল এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী। তারা বুঝতে পারবে আরএস (Revisional Survey) কেন করা হয় এবং পূর্ববর্তী জরিপের ভুল সংশোধনে এর ভূমিকা কী। একইভাবে এসএ (State Acquisition Survey) খতিয়ানের প্রয়োজনীয়তা, বিএস (Bangladesh Survey) খতিয়ানের ব্যবহার, বিডিএস (যদি কোনো অঞ্চলে প্রযোজ্য বিশেষ জরিপ বা ডিজিটাল জরিপ ব্যবস্থা থাকে) সম্পর্কে ধারণা এবং নামজারি বা খারিজি খতিয়ানের গুরুত্বও তারা শিখতে পারবে। পাশাপাশি দলিল, পর্চা, মৌজা ম্যাপ, খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ, উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি হস্তান্তর, হেবা, বণ্টননামা এবং নিবন্ধিত দলিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কেও প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করবে।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূমিসেবা ডিজিটাল বা অনলাইনভিত্তিক। অনলাইনে খতিয়ান যাচাই, ই-নামজারি আবেদন, ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ, বিভিন্ন আবেদনপত্রের অগ্রগতি অনুসরণসহ নানা সেবা এখন ঘরে বসেই গ্রহণ করা সম্ভব। বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় তারা খুব সহজেই এসব ডিজিটাল সেবা ব্যবহার করতে সক্ষম। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতার পাশাপাশি ভূমি-সংক্রান্ত মৌলিক জ্ঞান না থাকলে অনলাইন সেবার পূর্ণ সুবিধা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে ভূমি শিক্ষার সমন্বয় বর্তমান সময়ের একটি বাস্তব প্রয়োজন।
পরিবারেও ভূমি শিক্ষার চর্চা বাড়ানো জরুরি। অভিভাবকদের উচিত প্রতি মাসে অন্তত একদিন সন্তানদের সামনে পরিবারের দলিল, খতিয়ান, খাজনার রশিদ, নামজারির কাগজ, মৌজা ম্যাপ বা অন্যান্য ভূমি-সংক্রান্ত নথি তুলে ধরা এবং সেগুলোর মৌলিক বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা। এতে শিশুরা বাস্তব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সম্পর্কে পরিচিত হবে এবং ভবিষ্যতে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। যেমন আমরা সন্তানদের ব্যাংকিং, সঞ্চয় বা নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দিই, তেমনি ভূমি-সংক্রান্ত শিক্ষাও তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।
পাঠ্যপুস্তকে ভূমি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হলে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, দালালনির্ভরতা কমবে, ভূমি অফিসে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি হ্রাস পাবে, ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ সংকুচিত হবে, ভুল আবেদন বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে কাজের দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং সরকারি সেবার প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও মামলার সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে। একটি শিক্ষিত ও সচেতন সমাজই পারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে, আর ভূমি শিক্ষা সেই সচেতনতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে ভূমি কেবল একটি সম্পদ নয়; এটি অর্থনীতি, উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কৃষি, নগরায়ণ এবং পারিবারিক নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। তাই ভূমি শিক্ষা আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। জাতীয় শিক্ষাক্রমে ভূমি-সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলে আগামী প্রজন্ম আরও দায়িত্বশীল, আইন-সচেতন, প্রযুক্তিবান্ধব এবং দুর্নীতিবিরোধী নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। একটি সচেতন প্রজন্মই পারে ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা, হয়রানি ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। তাই ভবিষ্যতের স্বার্থে এখনই বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে ভূমি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। (লেখক: কবি-সাংবাদিক)